ঢাকাঃ প্রেমের ফাঁদ, রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপট আর একের পর এক বিয়ের প্রলোভন। এই তিনে মিলে ধ্বংস হয়ে গেছে একটি নারীর সাজানো সংসার, কেড়ে নেওয়া হয়েছে জীবনের সমস্ত সঞ্চয়। আশুলিয়ার আড়াগাও চকলেট ফ্যাক্টরি এলাকায় নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক নেতা সেলিম রেজার বিরুদ্ধে উঠেছে এমনই এক রোমহর্ষক ও নৃশংস প্রতারণার অভিযোগ। ভুক্তভোগী মোসাম্মদ লাকি আক্তার তিন্নির (৩০) জীবনকে নরকে পরিণত করে এখন পলাতক এই প্রতারক। এই ঘটনায় স্থানীয় এলাকাবাসীর মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
ইতিমধ্যে ভুক্তভোগী লাকি আক্তার তিন্নি আশুলিয়া থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। ঘটনার পর থেকে তিনি এখন সম্পূর্ণ নিঃস্ব ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০১১ সালে আশুলিয়ার আড়াগাও এলাকার শুকুর আলীর সাথে ইসলামি শরিয়ত মোতাবেক বিয়ে হয় তিন্নির। ২০২১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১০ বছর অত্যন্ত সুখে-শান্তিতে সংসার করছিলেন তারা। কিন্তু ২০২১ সালের শুরুর দিকে তিন্নির জীবনে কালনাগিনী হয়ে দেখা দেয় স্থানীয় তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা সেলিম রেজা (৩৫)। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ও নানামুখী ফুসলাানির মাধ্যমে তিন্নির সরলতার সুযোগ নেয় সেলিম। একপর্যায়ে তাকে বিয়ে করার অকাট্য প্রলোভন ও চাপ সৃষ্টি করে শুকুর আলীকে ডিভোর্স দিতে বাধ্য করে।
১০ বছরের সাজানো সংসার ভেঙে তিন্নি চলে আসেন সেলিমের কাছে। শুরু হয় একসাথে লিভ টুগেদার। কিন্তু বিয়ের জন্য চাপ দিলেই ভোল বদলে ফেলত সেলিম। দিনের পর দিন কালক্ষেপণ করে একপর্যায়ে সাফ জানিয়ে দেয়, সে বিয়ে করবে না! সুন্দর সংসার হারিয়ে প্রেমিকের লালসার সামগ্রীতে পরিণত হওয়া তিন্নি তখন লোকলজ্জা আর অপমানে একাধিকবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেন।
সামাজিকতা রক্ষা এবং বেঁচে থাকার তাগিদে পরিবারের অনুরোধে পরবর্তীতে মিরপুর-২ এর সৌদি প্রবাসী ফরহাদ হোসেনকে বিয়ে করেন তিন্নি। সেখানেও তিনি তিন বছর সুখেই কাটান। প্রবাসী স্বামী তাকে ১০ ভরি স্বর্ণালংকার ও নগদ ৩০ লাখ টাকা উপহার দেন। কিন্তু তিন্নির সুখ সহ্য হয়নি সেলিমের। অতীতের একান্ত মুহূর্তের ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তিন্নিকে দিনের পর দিন ব্ল্যাকমেইল করতে থাকে সে, বাধ্য করে অনৈতিক সম্পর্কে। একপর্যায়ে এসব যন্ত্রণার কথা স্বামী ফরহাদ জানতে পেরে, মানসিক আঘাত সহ্য করতে না পেরে সৌদি আরবেই স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ফরহাদ।
স্বামীকে হারিয়ে তিন্নি যখন পিত্রালয়ে (দোসাইদ কলেজ রোড) এসে শোকগ্রস্ত জীবন কাটাচ্ছিলেন, তখন সেলিমের চোখ পড়ে তিন্নির কাছে থাকা ৩০ লাখ টাকা ও ১০ ভরি সোনার ওপর। এবার সুর নরম করে, নিজের 'ভুল স্বীকার' করে নতুন করে ঘর বাঁধার নাটক সাজায় সেলিম। বাড়ি নির্মাণ করার অজুহাতে তিন্নির সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে হাতিয়ে নেয় নগদ ৩০ লক্ষ টাকা এবং জোরপূর্বক বিক্রি করে দেয় আনুমানিক ২৫ লক্ষ টাকা মূল্যের ১০ ভরি স্বর্ণালংকার।
এমনকি গত ১৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখ রাতেও তিন্নির বাসায় এসে বিয়ের আশ্বাস দিয়ে তার সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে এই প্রতারক।
টাকা ও সোনা হাতিয়ে নেওয়ার পর থেকেই তিন্নিকে এড়িয়ে চলতে শুরু করে সেলিম। গত ২২ জুন ২০২৬ তারিখ সন্ধ্যা আনুমানিক ৭:৪৫ মিনিটে তিন্নি নিরুপায় হয়ে সেলিমের ইমু নাম্বারে যোগাযোগ করে বিয়ের আকুতি জানালে সেলিম তাকে বিয়ে করতে এবং টাকা-পয়সা ফেরত দিতে সরাসরি অস্বীকার করে। উল্টো আইনের আশ্রয় নিলে তিন্নিকে 'দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার' অর্থাৎ প্রাণনাশের হুমকি দেয় এই ছাত্রলীগ নেতা।
বর্তমানে সম্পূর্ণ নিঃস্ব ও মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিন্নি। স্বজনদের সাথে আলোচনা করে অবশেষে আশুলিয়া থানায় হাজির হয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে সেলিম রেজার সাথে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, অভিযোগটি আমলে নেওয়া হয়েছে। অভিযোগটির তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে ঘটনার সত্যতা সাপেক্ষে দ্রুত কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সমাজের শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আশুলিয়া থানা পুলিশ বদ্ধপরিকর।
অন্যদিকে, ক্ষমতা হারানো নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতার এমন বেপরোয়া কাণ্ডে ফুঁসে উঠেছে এলাকাবাসী। তারা এই নরপশুর দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ ওমর ফারুক। প্রকাশক কর্তৃক বি,এস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবী সার্কুলার রোড , ঢাকা- ১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ২ আর কে মিশন রোড (৫ম তলা) থেকে প্রকাশিত।
© All rights reserved © 2017 Alokito Kantho