বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১২:২৭ পূর্বাহ্ন

কেমন করে হলো মানিকগঞ্জ নামকরন!

  • সর্বশেষ আপডেট শনিবার, ১৩ জুলাই, ২০১৯, ২.৫৯ পিএম

আল মামুন – ভ্রাম্যমান প্রতিনিধি : ১৮৪৫ সালের আগে মানিকগঞ্জ নামে কোন গ্রাম বা মৌজা বা পরগনার কোন অস্তিত্ব ছিল না । হযরত শাহ সুফি মানিক সাধু ( রঃ) এক বুজুর্গ আল্লাহর হুকুম পালন ও তাবেদারী করার জন্য দুনিয়ার ভোগ বিলাসিতা পরিত্যাগ করে আরব দেশ থেকে ভারত বর্ষে আগমন করেন। পন্চদশ শতাব্দীর কোনো এক সময়ে ধামরাই ও মানিকগঞ্জ জেলার প্রত্যন্ত অন্চলের ব্যাপক ভ্রমন করেছিলেন তিনি । এই মহান সাধকের সংস্পর্শে এসে বহু মানুষ আল্লাহর খাঁটি বান্দা হয়েছিলেন।
বাংলাদেশের যত শহর বন্দর, নগর সভ্যতা গড়ে উঠেছে, এসবের পিছনে সুফি সাধকদের অবস্থানগত ভূমিকাই ছিল  বেশি। সুফি  সাধকদের পদস্পর্শেই মূলতগড়ে উঠেছে বিভিন্ন হাট – বাজার, শহর -বন্দর, নগর – জনপদ।
তদ্রুপ মানিকগঞ্জ জেলার নামকরণ এর অন্তরালে জড়িয়ে আছে একজন মহান সুফি সাধকের নাম, তিনি হচ্ছেন “হযরত শাহ্‌ সুফি মানিক সাধু  (রঃ)।
এই মানিক সাধু ধামরাই থেকে প্রথমে সিংগাইর থানার মানিকনগর গ্রামে আসেন। তথায় খানকা প্রতিষ্ঠা করে ইসলাম ধর্ম প্রচার করেন।
এরপর সিংগাইর ছেড়ে হরিরামপুর উপজেলার দরবেশ হায়দার শেখ (রঃ)  এর মাজারে গমন করেন। ইছামতি নদীর তীর বর্তী জনশূন্য চরাভূমি বর্তমান মানিকনগর বাজারে এসে খানকা প্রতিষ্ঠা করেন। এই খানকে কেন্দ্র করে এখানে গড়ে উঠে জনবসতি। হরিরামপুর খানকায় কিছু দিন অবস্থান করার পর তিনি ধামরাই এর উদ্দেশ্যে রওনা দেন। প্রতিমধ্যে বর্তমান জাগীর নামক স্হানে  ধলেশ্বরী নদীর তীরে এলাকার নৈসর্গিক দৃশ্য দেখে তৃতীয় খানকা প্রতিষ্ঠিত করেন। এই খানকাতেই মানিক সাধু দীর্ঘ দিন অবস্থান করেন। এই খানকাতে প্রথম ও দ্বিতীয় খানকার ভক্ত বৃন্দ এসেও জড়ো হইত।
ধলেশ্বরী তীরবর্তী এই খানকাতে অবস্থান কালে অনেক অলৌকিক ঘটনা প্রকাশ পায়। ধলেশ্বরী নদী পথে স্টীমার লন্চ, সওদাগীরি নৌকা গুলো রাত্রি কালে এই খানকার আশেপাশে অবস্থান করত। নদী পথের জলদস্যুরা মানিক শাহের অলৌকিক ক্ষমতার কথা জানত। তাই এই খানকার আশেপাশে আসতে ভয় পেত।
এভাবেই ” জাগীর ধলেশ্বরী নদীর ” তীর মানিক শাহের খানকাকে ঘিরে জনবসতি ও বন্দর গড়ে উঠে।
জাগীর ধলেশ্বরী নদীর এই বন্দরেই ব্রিটিশ শাসনামলে বড় বড় বানিজ্যিক জাহাজগুলো এক কালের সোনালী আঁশ খ্যাত পাটসহ অন্যান্য পণ্য সামগ্রী জাহাজে ভর্তি ও খালাস হতো।হান্টার সাহেবের জরিপ কালীন সময়ে জাগীর এর মোকাম জাহাজ ঘাট দুই কিলোমিটার এলাকা ব্যাপি বিস্তৃত ছিল। তৎকালীন ঢাকা জেলার অন্য মহকুমার তুলনায ধলেশ্বরী নদীর এই মোকাম বা গন্জ অনেক   উন্নত ছিল।
একদিন মানিক শাহ তাঁর ভক্ত বৃন্দের নিকট ধামরাই হয়ে সোনারগাঁও যাবার বাসনা করেন। কিন্তু ভক্ত শিষ্য গন নাছোড়বান্দা। তারা কিছুতেই গুরুকে ছাড়বেন না। অতঃপর একদিন গভীর রাতে ভক্ত শিষ্যরা জেকেরে মোহোবিষ্ট, তখন মানিক শাহ ধলেশ্বরী নদী   পেরিয়ে অদৃশ্য হয়ে যান। শিষ্য গণ পরে গান বেঁধেছিলেন
“”  মানিক শাহ্ দরবেশ ছিল,
ধল্লা (ধলেশ্বরী)গান পাড়াইয়া গেল
সিন্ধুতে বিন্দু হইলো তাজা তাতে ধল্লা গাং হইলো বাজা।””
মানিক শাহ্ চলে গেলেও তাঁর খানকা ও তৎসংলগ্ন মোকাম বা গন্জ পরবর্তী কালে তাঁর নামানুসারে, “মানিকগন্জ “হয়েছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নাই।

১৮৪৫ সালে মে মাসে ফরিদপুর জেলার অধীনে মানিকগন্জ   মহাকুমার নামকরণকরা হয়েছিল । বর্তমান
মানিকগন্জ শহর থেকে প্রায় সাড়ে তিন মাইল উত্তর পূর্বে পুরোনো মূল ধলেশ্বরী নদীর পশ্চিম পাড়ে জাগীর নামক স্হানে মানিক সাধুর নামানুসারেই “মানিকগন্জ “মহাকুমা  নামকরণ করা হয়।  তখন উত্ত স্থান বূহৎ বানিজ্যিক বন্দর এলাকা হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল। এই বন্দর এলাকাতেই স্হাপিত হয়েছিল মহাকুমা সদর।  আর  মহাকুমা সদর ছিল প্রশাসনের নাভি কেন্দ্র।
১৮৫৫ খ্রীষ্টাব্দ হতে ১৮৬৫ খ্রীষ্টাব্দ সময় কালে প্রাচীন মহাকুমা সদরের উত্তর -পূর্ব প্রান্তের গুরুত্ব পূর্ণ এলাকা ধলেশ্বরী নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায়।এর ফলে বাণিজ্য ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান সমুহ সরে যায়।
জনশ্রুতি আছে যে ধলেশ্বরীর ভাঙন “মানিকগন্জ এলাকা ” এত ব্যাপক ও মর্মান্তিক ছিল যে, মানুষ ঘরবাড়ি ও আসবাবপত্র নিরাপদ দূরত্বে নিয়ে যাওয়ার সময় পেত না।
বিশ শতকের প্রথম দশকেই মানিকগন্জ মহাকুমা “সদর দপ্তর দাশরাতে অস্হায়ীভাবে স্হানান্তরির হয় এবং থানা  স্হাপিত হয় বর্তমান বেউথা ব্রীজ এর উত্তর বাজার এলাকায়। কিন্তু কালিগঙ্গা নদীর ভাঙনে সেখানেও বেশি দিন স্হায়ী ছিল না।
১৮৫৬ সালে  মানিকগন্জ মহাকুমাকে ফরিদপুর জেলার অধীন থেকে কেটে  ঢাকা জেলার সাথে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আরও সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

themebaalokitokant1852550985
©2019 All rights reserved Alokitokantho
Devoloped by alokito kantho.com