১২:৩৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

রংপুর অঞ্চলে বেড়েছে তামাক, কমেছে আলুচাষ

 

রংপুরঃ রংপুর অঞ্চলে চলতি মৌসুমে তামাকচাষ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, বিপরীতে কমেছে আলুচাষ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর রংপুর অঞ্চলে তামাকের চাষ হয়েছে প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমিতে, যা গত বছর ছিল ১৮ হাজার ৭০০ হেক্টর। অর্থাৎ এক বছরে তামাকচাষ বেড়েছে প্রায় ১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে।

অন্যদিকে, আলুচাষ কমেছে আরও উদ্বেগজনক হারে। চলতি বছর আলুচাষ হয়েছে ১ লাখ ৫ হাজার ৭১৯ হেক্টর জমিতে, যেখানে গত বছর এই পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১৯ হাজার ৭১৯ হেক্টর। অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ১৪ হাজার হেক্টর জমিতে আলুচাষ কমে গেছে।

রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও গাইবান্ধা—এই চার জেলায় মূলত তামাকচাষ হয়ে থাকে। এর মধ্যে লালমনিরহাট জেলায় সবচেয়ে বেশি তামাকের চাষ হচ্ছে।

তবে অ্যান্টি টোব্যাকো মিডিয়া অ্যালিয়েন্স (এটিএমএ) দাবি করেছে, কৃষি বিভাগ যে পরিমাণ জমিতে তামাকচাষের হিসাব দেখাচ্ছে, বাস্তবে এর দ্বিগুণ জমিতে তামাক চাষ হচ্ছে। সংগঠনটির মতে, রংপুর অঞ্চলের সবচেয়ে উর্বর কৃষিজমিগুলো ধীরে ধীরে তামাকচাষের দখলে চলে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত মৌসুমে আলুচাষে ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছেন তারা। বিপরীতে তামাকচাষে অনেকেই অপ্রত্যাশিতভাবে লাভবান হয়েছেন। ফলে এ বছর আলুচাষের জমিতে ব্যাপকভাবে তামাকচাষে ঝুঁকেছেন কৃষকরা।

কৃষকদের অভিযোগ, তামাক কোম্পানিগুলো পরিকল্পিতভাবেই তাদের তামাকচাষে উৎসাহ দিচ্ছে। এসব কোম্পানি কৃষকদের বিনামূল্যে বীজ ও সার, মাঠপর্যায়ে পরামর্শ এবং সুদমুক্ত ঋণ সুবিধা দিচ্ছে। আলুসহ অন্যান্য ফসলে লোকসান অব্যাহত থাকলে আগামী দিনে তামাকচাষ আরও বাড়বে বলেও আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রংপুর সদর উপজেলার মমিনপুর ইউনিয়নের নয়াপাড়া গ্রামের কৃষক মাহবুবুর রহমান (৬৫) জানান, এ বছর তিনি গত বছরের তুলনায় তিন বিঘা বেশি জমিতে তামাকচাষ করেছেন।

“গত বছর পাঁচ বিঘা জমিতে তামাক ছিল। আলুচাষে লোকসানের কারণে এ বছর আর আলু করিনি। তামাক কোম্পানির পরামর্শেই বেশি জমিতে তামাক করেছি। আশা করছি এবারও ভালো লাভ হবে,” বলেন তিনি।
একই গ্রামের কৃষক নুরুজ্জামান হক (৬০) বলেন, “মমিনপুর ইউনিয়নের যেদিকেই তাকান, শুধু তামাক আর তামাক। গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ জমিতে তামাক হয়েছে।”

তিনি জানান, গত বছর তিনি আট বিঘা জমিতে তামাক করলেও এ বছর করছেন ১৩ বিঘা জমিতে। প্রতিবিঘা জমিতে ৩৬০ থেকে ৪০০ কেজি তামাক উৎপাদন হয়। প্রতিকেজি তামাক বিক্রি হচ্ছে ১৯০ থেকে ২১০ টাকা দরে। এক বিঘা জমিতে তামাকচাষে খরচ পড়ে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা।

“তামাকের জন্য সবচেয়ে উর্বর জমি দরকার। পরিবারের সবাই মিলে কাজ করতে হয়। পরিশ্রম বেশি হলেও লাভের কারণে আমরা এটাকে অর্থকারী ফসল বলেই মনে করি,” বলেন তিনি।

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার সারপুকুর গ্রামের কৃষক নিতেশ চন্দ্র বর্মণ (৬০) জানান, শুধু সারপুকুর নয়—পুরো আদিতমারী উপজেলাজুড়েই তামাকচাষ হচ্ছে।
“এ উপজেলায় অন্তত সাতটি তামাক কোম্পানির অফিস রয়েছে। উৎপাদিত তামাক বিক্রি নিয়ে আমাদের কোনো দুশ্চিন্তা নেই। গত বছর ১০ বিঘা জমিতে তামাক করেছি, এবার করেছি ১৫ বিঘা। আলুচাষে লোকসান হওয়ায় এ বছর আলু করিনি,” বলেন তিনি।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, তামাক কোম্পানির কার্ড থাকায় কৃষকরা নিশ্চিত বাজার সুবিধা পাচ্ছেন। কোনো কৃষক বিপদে পড়লে কোম্পানিগুলো সহযোগিতাও করে।“একসঙ্গে মোটা অঙ্কের টাকা পাওয়া যায়, এজন্য পরিশ্রমটা পরিশ্রম মনে হয় না।

অ্যান্টি টোব্যাকো মিডিয়া অ্যালিয়েন্সের সদস্য খোরশেদ আলম বলেন, “মাঠপর্যায়ে তামাক কোম্পানির প্রতিনিধিদের অবাধ বিচরণ বন্ধ না করলে তামাকচাষ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। এখানে শিল্পকারখানা গড়ে না উঠলেও দেশি-বিদেশি তামাক কোম্পানি গড়ে উঠেছে। কৃষি বিভাগের তামাকবিরোধী কার্যক্রম খুবই দুর্বল।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বিদেশি তামাক কোম্পানির প্রতিনিধি স্বীকার করেন,“আমাদের কাজই হলো কৃষকদের তামাকচাষে উদ্বুদ্ধ করা। কৃষকদের আনুগত্য ধরে রাখতে আমরা সব ধরনের সহায়তার দিকে নজর দিই।”

রংপুর বিভাগীয় মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. সফিনুর রহমান বলেন, “তামাকচাষ আমাদের জমির উর্বরতাকে ধ্বংস করছে। তামাকচাষ করা জমি ও আশপাশের জমির উর্বরতা ধীরে ধীরে কমে যায়। তামাক একটি বহুমূল ফসল হওয়ায় এতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহার করতে হয়, যা জমির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম জানান, “তামাকচাষ আইনগতভাবে নিষিদ্ধ নয় বলে আমরা কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারছি না। তামাকচাষ নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারকে আইন প্রণয়ন করতে হবে। এ বিষয়ে আমরা কৃষি মন্ত্রণালয়ে পত্র দিয়েছি।”

লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক এইচ এম রকিব হায়দার বলেন, তামাকচাষ নিয়ন্ত্রণে কীভাবে ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সে বিষয়ে আমরা কাজ শুরু করেছি। এভাবে তামাকচাষ বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদনে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে।”

Tag :
About Author Information

জনপ্রিয়

একটি হারানো সংবাদ

রংপুর অঞ্চলে বেড়েছে তামাক, কমেছে আলুচাষ

প্রকাশের সময়ঃ ০৪:২৩:২৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ জানুয়ারী ২০২৬

 

রংপুরঃ রংপুর অঞ্চলে চলতি মৌসুমে তামাকচাষ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, বিপরীতে কমেছে আলুচাষ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর রংপুর অঞ্চলে তামাকের চাষ হয়েছে প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমিতে, যা গত বছর ছিল ১৮ হাজার ৭০০ হেক্টর। অর্থাৎ এক বছরে তামাকচাষ বেড়েছে প্রায় ১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে।

অন্যদিকে, আলুচাষ কমেছে আরও উদ্বেগজনক হারে। চলতি বছর আলুচাষ হয়েছে ১ লাখ ৫ হাজার ৭১৯ হেক্টর জমিতে, যেখানে গত বছর এই পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১৯ হাজার ৭১৯ হেক্টর। অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ১৪ হাজার হেক্টর জমিতে আলুচাষ কমে গেছে।

রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও গাইবান্ধা—এই চার জেলায় মূলত তামাকচাষ হয়ে থাকে। এর মধ্যে লালমনিরহাট জেলায় সবচেয়ে বেশি তামাকের চাষ হচ্ছে।

তবে অ্যান্টি টোব্যাকো মিডিয়া অ্যালিয়েন্স (এটিএমএ) দাবি করেছে, কৃষি বিভাগ যে পরিমাণ জমিতে তামাকচাষের হিসাব দেখাচ্ছে, বাস্তবে এর দ্বিগুণ জমিতে তামাক চাষ হচ্ছে। সংগঠনটির মতে, রংপুর অঞ্চলের সবচেয়ে উর্বর কৃষিজমিগুলো ধীরে ধীরে তামাকচাষের দখলে চলে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত মৌসুমে আলুচাষে ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছেন তারা। বিপরীতে তামাকচাষে অনেকেই অপ্রত্যাশিতভাবে লাভবান হয়েছেন। ফলে এ বছর আলুচাষের জমিতে ব্যাপকভাবে তামাকচাষে ঝুঁকেছেন কৃষকরা।

কৃষকদের অভিযোগ, তামাক কোম্পানিগুলো পরিকল্পিতভাবেই তাদের তামাকচাষে উৎসাহ দিচ্ছে। এসব কোম্পানি কৃষকদের বিনামূল্যে বীজ ও সার, মাঠপর্যায়ে পরামর্শ এবং সুদমুক্ত ঋণ সুবিধা দিচ্ছে। আলুসহ অন্যান্য ফসলে লোকসান অব্যাহত থাকলে আগামী দিনে তামাকচাষ আরও বাড়বে বলেও আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রংপুর সদর উপজেলার মমিনপুর ইউনিয়নের নয়াপাড়া গ্রামের কৃষক মাহবুবুর রহমান (৬৫) জানান, এ বছর তিনি গত বছরের তুলনায় তিন বিঘা বেশি জমিতে তামাকচাষ করেছেন।

“গত বছর পাঁচ বিঘা জমিতে তামাক ছিল। আলুচাষে লোকসানের কারণে এ বছর আর আলু করিনি। তামাক কোম্পানির পরামর্শেই বেশি জমিতে তামাক করেছি। আশা করছি এবারও ভালো লাভ হবে,” বলেন তিনি।
একই গ্রামের কৃষক নুরুজ্জামান হক (৬০) বলেন, “মমিনপুর ইউনিয়নের যেদিকেই তাকান, শুধু তামাক আর তামাক। গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ জমিতে তামাক হয়েছে।”

তিনি জানান, গত বছর তিনি আট বিঘা জমিতে তামাক করলেও এ বছর করছেন ১৩ বিঘা জমিতে। প্রতিবিঘা জমিতে ৩৬০ থেকে ৪০০ কেজি তামাক উৎপাদন হয়। প্রতিকেজি তামাক বিক্রি হচ্ছে ১৯০ থেকে ২১০ টাকা দরে। এক বিঘা জমিতে তামাকচাষে খরচ পড়ে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা।

“তামাকের জন্য সবচেয়ে উর্বর জমি দরকার। পরিবারের সবাই মিলে কাজ করতে হয়। পরিশ্রম বেশি হলেও লাভের কারণে আমরা এটাকে অর্থকারী ফসল বলেই মনে করি,” বলেন তিনি।

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার সারপুকুর গ্রামের কৃষক নিতেশ চন্দ্র বর্মণ (৬০) জানান, শুধু সারপুকুর নয়—পুরো আদিতমারী উপজেলাজুড়েই তামাকচাষ হচ্ছে।
“এ উপজেলায় অন্তত সাতটি তামাক কোম্পানির অফিস রয়েছে। উৎপাদিত তামাক বিক্রি নিয়ে আমাদের কোনো দুশ্চিন্তা নেই। গত বছর ১০ বিঘা জমিতে তামাক করেছি, এবার করেছি ১৫ বিঘা। আলুচাষে লোকসান হওয়ায় এ বছর আলু করিনি,” বলেন তিনি।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, তামাক কোম্পানির কার্ড থাকায় কৃষকরা নিশ্চিত বাজার সুবিধা পাচ্ছেন। কোনো কৃষক বিপদে পড়লে কোম্পানিগুলো সহযোগিতাও করে।“একসঙ্গে মোটা অঙ্কের টাকা পাওয়া যায়, এজন্য পরিশ্রমটা পরিশ্রম মনে হয় না।

অ্যান্টি টোব্যাকো মিডিয়া অ্যালিয়েন্সের সদস্য খোরশেদ আলম বলেন, “মাঠপর্যায়ে তামাক কোম্পানির প্রতিনিধিদের অবাধ বিচরণ বন্ধ না করলে তামাকচাষ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। এখানে শিল্পকারখানা গড়ে না উঠলেও দেশি-বিদেশি তামাক কোম্পানি গড়ে উঠেছে। কৃষি বিভাগের তামাকবিরোধী কার্যক্রম খুবই দুর্বল।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বিদেশি তামাক কোম্পানির প্রতিনিধি স্বীকার করেন,“আমাদের কাজই হলো কৃষকদের তামাকচাষে উদ্বুদ্ধ করা। কৃষকদের আনুগত্য ধরে রাখতে আমরা সব ধরনের সহায়তার দিকে নজর দিই।”

রংপুর বিভাগীয় মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. সফিনুর রহমান বলেন, “তামাকচাষ আমাদের জমির উর্বরতাকে ধ্বংস করছে। তামাকচাষ করা জমি ও আশপাশের জমির উর্বরতা ধীরে ধীরে কমে যায়। তামাক একটি বহুমূল ফসল হওয়ায় এতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহার করতে হয়, যা জমির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম জানান, “তামাকচাষ আইনগতভাবে নিষিদ্ধ নয় বলে আমরা কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারছি না। তামাকচাষ নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারকে আইন প্রণয়ন করতে হবে। এ বিষয়ে আমরা কৃষি মন্ত্রণালয়ে পত্র দিয়েছি।”

লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক এইচ এম রকিব হায়দার বলেন, তামাকচাষ নিয়ন্ত্রণে কীভাবে ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সে বিষয়ে আমরা কাজ শুরু করেছি। এভাবে তামাকচাষ বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদনে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে।”