১১:৫৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

রংপুর-৩ ভোটারদের হৃদয়ে জায়গা করে নিচ্ছেন তৃতীয় লিঙ্গের প্রার্থী রানী

রংপুরঃ আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রংপুরের রাজনীতিতে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে তৃতীয় লিঙ্গের প্রার্থী আনোয়ারা ইসলাম রানী (৩৩)।

রংপুর-৩ আসনের অলিগলি, হাটবাজার, শ্রমিকপাড়া আর ছিন্নমূল মানুষের বসতিতে দিনরাত ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে কথা বলছেন—শুনছেন তাদের কষ্ট, আশা আর না–পাওয়ার গল্প। এই সরল উপস্থিতিই ধীরে ধীরে তাকে আলাদা করে তুলেছে অন্য প্রার্থীদের ভিড়ে।

বিশেষ করে শ্রমিক, দিনমজুর, ভ্যানচালক, ছিন্নমূল মানুষ, গৃহকর্মী ও সাধারণ নারীদের কাছে রানী এখন এক পরিচিত নাম। খেটে খাওয়া মানুষের সঙ্গে তার এক ধরনের আত্মিক টান তৈরি হয়েছে। কেউ তাকে ডাকেন ‘রানী আপা’, কেউ বলেন ‘আমাদের মানুষ’।

রানী এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন রংপুর-৩ আসন (রংপুর সদর ও রংপুর সিটি করপোরেশনের আংশিক এলাকা) থেকে। এর আগেও তিনি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসন থেকে স্বতন্ত প্রার্থী হিসেবে ঈগল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছিলেন।এবার ঈগল দলীয় প্রতীক হয়ে যাওয়ায় হরিণ অথবা মোরগ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।

এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের, বিএনপির প্রার্থী সামসুজ্জামান সামু, জামায়াতে ইসলামীর মাহমুদুর রহমানসহ বিভিন্ন দলের আরও পাঁচজন প্রার্থী। রংপুর-৩ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৮ হাজার ২২৩ জন। রংপুর সিটি করপোরেশনের ৯ থেকে ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড এবং সদর উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই আসন।

উল্লেখ্য, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে আনোয়ারা ইসলাম রানী পেয়েছিলেন ২৩ হাজার ৩৩৯ ভোট। ভোটের ফলাফল যাই হোক, ওই নির্বাচনে প্রান্তিক মানুষের সমর্থনে তার উত্থান রংপুরের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।

আনোয়ারা ইসলাম রানী বলেন, “আমি কোনো ক্ষমতার জোরে নয়, কোনো দলের ছায়ায় নয়—শুধু মানুষের ভালোবাসা, বিশ্বাস আর ন্যায়ের শক্তি নিয়েই এগোতে চাই। অবহেলিত মানুষের পাশে থাকাই আমার রাজনীতির মূল লক্ষ্য।

তিনি আরও বলেন, “আমি রাজনীতি করতে এসেছি সুবিধাভোগী হতে নয়। এসেছি মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য, স্বাধীনভাবে কথা বলার জন্য। অবহেলিত কণ্ঠ যেন কেউ রোধ করতে না পারে—এই লড়াই সেই কারণেই। আমার কোনো সংসার নেই, কোনো পিছুটান নেই। তাই আমার পুরো সময়, শক্তি আর দায়বদ্ধতা আমি রংপুর-৩ আসনের মানুষের জন্যই দিতে চাই।”

রানীর ভাষায়, “এই সংগ্রাম আমার ব্যক্তিগত নয়। এটি একটি মানবিক দায়, একটি ন্যায়ের আন্দোলন। কৃষক, শ্রমিক, নারী, তরুণ, বয়স্ক মানুষ, সংখ্যালঘু ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সম্মান ও ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়েই আমার এই পথচলা।”

নগরীর আলমনগর এলাকার মুদির দোকানদার খলিলুর রহমান (৫৫) বলেন, “তৃতীয় লিঙ্গের হয়েও আনোয়ারা ইসলাম রানী যে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন, তা ইতিহাসে লেখা থাকবে। তিনি সবসময় অবহেলিত মানুষের পাশে থাকেন। গতবার আমি তাকে ভোট দিয়েছিলাম। তিনি আসলে জিতেছিলেন, কিন্তু ভোট চোরেরা তাকে জিততে দেয়নি। এবারও আমরা তার পাশেই থাকবো।”

নগরীর মডার্ন এলাকার গৃহকর্মী শাবানা বেগম (৪৫) বলেন, “রানী আপাকে আমার খুব ভালো লাগে। তিনি সবসময় আমাদের কথা বলেন। আমাদের কষ্ট বোঝেন। গতবার তাকে ভোট দিয়েছিলাম, এবারও দিবো। আমাদের এলাকায় কয়েকজন অসুস্থ হলে তিনি নিজে এসে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন।”

রংপুর নগরীর সমাজসেবক ও রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, রংপুর-৩ আসনের রাজনীতিতে আনোয়ারা ইসলাম রানী এখন কেবল একজন প্রার্থী নন—অনেক প্রান্তিক মানুষের কাছে তিনি হয়ে উঠেছেন সাহস, প্রতিবাদ আর মানবিক রাজনীতির প্রতীক। ধীরে ধরে তার পথচলা শক্তিতে পরিনত হচ্ছে। সাধারন মানুষ তার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি সৃষ্টি করছেন। মানুষজন তাকে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন। এ আসনে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনাও রয়েছে।

Tag :
About Author Information

জনপ্রিয়

একটি হারানো সংবাদ

রংপুর-৩ ভোটারদের হৃদয়ে জায়গা করে নিচ্ছেন তৃতীয় লিঙ্গের প্রার্থী রানী

প্রকাশের সময়ঃ ০৭:৫৩:৪৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৬

রংপুরঃ আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রংপুরের রাজনীতিতে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে তৃতীয় লিঙ্গের প্রার্থী আনোয়ারা ইসলাম রানী (৩৩)।

রংপুর-৩ আসনের অলিগলি, হাটবাজার, শ্রমিকপাড়া আর ছিন্নমূল মানুষের বসতিতে দিনরাত ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে কথা বলছেন—শুনছেন তাদের কষ্ট, আশা আর না–পাওয়ার গল্প। এই সরল উপস্থিতিই ধীরে ধীরে তাকে আলাদা করে তুলেছে অন্য প্রার্থীদের ভিড়ে।

বিশেষ করে শ্রমিক, দিনমজুর, ভ্যানচালক, ছিন্নমূল মানুষ, গৃহকর্মী ও সাধারণ নারীদের কাছে রানী এখন এক পরিচিত নাম। খেটে খাওয়া মানুষের সঙ্গে তার এক ধরনের আত্মিক টান তৈরি হয়েছে। কেউ তাকে ডাকেন ‘রানী আপা’, কেউ বলেন ‘আমাদের মানুষ’।

রানী এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন রংপুর-৩ আসন (রংপুর সদর ও রংপুর সিটি করপোরেশনের আংশিক এলাকা) থেকে। এর আগেও তিনি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসন থেকে স্বতন্ত প্রার্থী হিসেবে ঈগল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছিলেন।এবার ঈগল দলীয় প্রতীক হয়ে যাওয়ায় হরিণ অথবা মোরগ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।

এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের, বিএনপির প্রার্থী সামসুজ্জামান সামু, জামায়াতে ইসলামীর মাহমুদুর রহমানসহ বিভিন্ন দলের আরও পাঁচজন প্রার্থী। রংপুর-৩ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৮ হাজার ২২৩ জন। রংপুর সিটি করপোরেশনের ৯ থেকে ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড এবং সদর উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই আসন।

উল্লেখ্য, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে আনোয়ারা ইসলাম রানী পেয়েছিলেন ২৩ হাজার ৩৩৯ ভোট। ভোটের ফলাফল যাই হোক, ওই নির্বাচনে প্রান্তিক মানুষের সমর্থনে তার উত্থান রংপুরের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।

আনোয়ারা ইসলাম রানী বলেন, “আমি কোনো ক্ষমতার জোরে নয়, কোনো দলের ছায়ায় নয়—শুধু মানুষের ভালোবাসা, বিশ্বাস আর ন্যায়ের শক্তি নিয়েই এগোতে চাই। অবহেলিত মানুষের পাশে থাকাই আমার রাজনীতির মূল লক্ষ্য।

তিনি আরও বলেন, “আমি রাজনীতি করতে এসেছি সুবিধাভোগী হতে নয়। এসেছি মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য, স্বাধীনভাবে কথা বলার জন্য। অবহেলিত কণ্ঠ যেন কেউ রোধ করতে না পারে—এই লড়াই সেই কারণেই। আমার কোনো সংসার নেই, কোনো পিছুটান নেই। তাই আমার পুরো সময়, শক্তি আর দায়বদ্ধতা আমি রংপুর-৩ আসনের মানুষের জন্যই দিতে চাই।”

রানীর ভাষায়, “এই সংগ্রাম আমার ব্যক্তিগত নয়। এটি একটি মানবিক দায়, একটি ন্যায়ের আন্দোলন। কৃষক, শ্রমিক, নারী, তরুণ, বয়স্ক মানুষ, সংখ্যালঘু ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সম্মান ও ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়েই আমার এই পথচলা।”

নগরীর আলমনগর এলাকার মুদির দোকানদার খলিলুর রহমান (৫৫) বলেন, “তৃতীয় লিঙ্গের হয়েও আনোয়ারা ইসলাম রানী যে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন, তা ইতিহাসে লেখা থাকবে। তিনি সবসময় অবহেলিত মানুষের পাশে থাকেন। গতবার আমি তাকে ভোট দিয়েছিলাম। তিনি আসলে জিতেছিলেন, কিন্তু ভোট চোরেরা তাকে জিততে দেয়নি। এবারও আমরা তার পাশেই থাকবো।”

নগরীর মডার্ন এলাকার গৃহকর্মী শাবানা বেগম (৪৫) বলেন, “রানী আপাকে আমার খুব ভালো লাগে। তিনি সবসময় আমাদের কথা বলেন। আমাদের কষ্ট বোঝেন। গতবার তাকে ভোট দিয়েছিলাম, এবারও দিবো। আমাদের এলাকায় কয়েকজন অসুস্থ হলে তিনি নিজে এসে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন।”

রংপুর নগরীর সমাজসেবক ও রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, রংপুর-৩ আসনের রাজনীতিতে আনোয়ারা ইসলাম রানী এখন কেবল একজন প্রার্থী নন—অনেক প্রান্তিক মানুষের কাছে তিনি হয়ে উঠেছেন সাহস, প্রতিবাদ আর মানবিক রাজনীতির প্রতীক। ধীরে ধরে তার পথচলা শক্তিতে পরিনত হচ্ছে। সাধারন মানুষ তার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি সৃষ্টি করছেন। মানুষজন তাকে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন। এ আসনে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনাও রয়েছে।