
কুড়িগ্রামঃ কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলায় বহুদিনের প্রত্যাশিত একটি সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হলেও স্থানীয় এক বিএনপি নেতার বাধায় সংযোগ সড়ক নির্মাণ বন্ধ হয়ে আছে। ফলে প্রায় ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুটি ব্যবহার করতে পারছেন না এলাকাবাসী। এতে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন কয়েকটি গ্রামের মানুষ, শিক্ষার্থী, কৃষক ও রোগীরা।
ঘটনাটি রৌমারী উপজেলার সদর ইউনিয়নের বাওয়াইরগ্রাম এলাকায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, মূল সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে প্রায় ছয় মাস আগে। কিন্তু এখনো সংযোগ সড়ক নির্মাণ না হওয়ায় সেতুটি কার্যত অচল হয়ে পড়ে আছে।
স্থানীয়রা জানান, সেতু নির্মাণ শেষে সংযোগ সড়ক তৈরির প্রস্তুতি হিসেবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গাইডওয়ালের খুঁটি স্থাপন করেছিল। কিন্তু পরে স্থানীয় বিএনপি নেতার চাপের মুখে ঠিকাদার সেই খুঁটি তুলে ফেলতে বাধ্য হন। অভিযোগ রয়েছে, যাদুরচর ইউনিয়নের গোলাবাড়ি এলাকার বাসিন্দা ও ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি শাহাজাহান মন্ডল সংযোগ সড়ক নির্মাণে বাধা দিচ্ছেন। বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকায় তার প্রভাব বেশি হওয়ায় ঠিকাদার ও প্রকৌশলীরা কাজ শুরু করতে সাহস পাচ্ছেন না।
স্থানীয় বাসিন্দা নূর ইসলাম মন্ডল বলেন, “সংযোগ সড়ক না থাকায় সেতুটি আমাদের কোনো কাজে আসছে না। যাতায়াতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এত টাকার সেতু যদি ব্যবহারই করতে না পারি, তাহলে লাভ কী?”
ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক চালক শফিকুল ইসলাম জানান, তিনি কর্তিমারী বাজার থেকে বাওয়াইরগ্রাম পর্যন্ত গাড়ি চালান। এতে জনপ্রতি ভাড়া পান ১০ টাকা। “সংযোগ সড়ক থাকলে চুলিয়ারচর পর্যন্ত যাওয়া যেত। তখন ভাড়াও দ্বিগুণ হতো। সড়ক না হওয়ায় সেতু চালু হচ্ছে না, আয় কমে গেছে, যাত্রীদেরও দুর্ভোগ বেড়েছে,” বলেন তিনি।
স্কুলশিক্ষার্থী সিরাজুল ইসলাম জানায়, সংযোগ সড়ক না থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ সিঁড়ি বেয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। “সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামার সময় যেকোনো মুহূর্তে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। দ্রুত সংযোগ সড়ক নির্মাণ করে সেতুটি চালু করা দরকার,” বলে সে।
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, ২০২২–২৩ অর্থবছরে রৌমারী উপজেলার কর্তিমারী জিসি ভায়া বড়াইবাড়ি বিওপি ক্যাম্প সড়কে ৬০ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি আরসিসি গার্ডার সেতু নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করা হয়। কাজটি পায় জামালপুরের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেলানদহ এমসিই এমবিই জেভী। এর স্বত্বাধিকারী সামসুদ্দিন হায়দার। সেতুটির নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ৫ কোটি ৮৯ লাখ ৪৪ হাজার ৫৮০ টাকা। ২০২২ সালের ১৭ নভেম্বর কাজ শুরু হয়ে ২০২৩ সালের ১৭ মে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নানা জটিলতায় নির্মাণ শেষ হয় ২০২৫ সালের জুন মাসে।
ঠিকাদার সামসুদ্দিন হায়দার জানান, সেতু নির্মাণকালে যাদুরচর ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি শাহাজাহান মন্ডলসহ কয়েকজন জমির মালিকানা দাবি করে কাজ বন্ধের চেষ্টা করেন। “সেতু নির্মাণের স্বার্থে শাহাজাহান মন্ডলকে ৪ লাখ টাকা ও ছককু আলীকে ৩ লাখ টাকা দিতে হয়েছে। এছাড়া সড়কসংলগ্ন একটি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় একটি আধা-পাকা ঘর নির্মাণ করে দিতে হয়েছে। নির্মাণকালে ১০–১৫ লাখ টাকার মালামালও চুরি হয়েছে,” বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, “সেতু নির্মাণ করতে গিয়ে আমি মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছি। এখন সংযোগ সড়ক নির্মাণ করতে গেলেও আবার বাধার সম্মুখীন হচ্ছি। বিএনপি নেতা পুনরায় জমির ক্ষতিপূরণ দাবি করছেন। একদিকে এলজিইডি দ্রুত কাজ শেষ করতে চাপ দিচ্ছে, অন্যদিকে বাধা—আমি দিশেহারা হয়ে পড়েছি।”
এ বিষয়ে যাদুরচর ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি শাহাজাহান মন্ডল বলেন, “সংযোগ সড়কের জায়গাটি আমাদের রেকর্ডীয় সম্পত্তি। প্রায় এক বিঘা জমি সড়কের আওতায় পড়েছে। তাই ন্যায্য ক্ষতিপূরণ চাইছি। ক্ষতিপূরণ পেলে আমার কোনো আপত্তি নেই।” ঠিকাদারের কাছ থেকে ৪ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, “ক্ষতিপূরণ পেলে কি আমি কাজ বন্ধ করে দিতাম?”
রৌমারী উপজেলা প্রকৌশলী মনছুরুল হক জানান, উদ্ভূত সমস্যার সমাধান করে দ্রুত সংযোগ সড়ক নির্মাণ সম্পন্ন করতে ঠিকাদারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। “চলতি জানুয়ারি মাসের মধ্যে সংযোগ সড়ক নির্মাণ শেষ না হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে,” বলেন তিনি।
সহিদুল ইসলাম বিভাগীয় প্রতিনিধি রংপুরঃ 


















