০৫:৪৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আরাফার দিবসের গুরুত্ব ও ফজিলত

 

✍️মাওলানা শেখ মিলাদ হোসাইন সিদ্দিকীঃ ভূমিকা:জিলহজ্জ মাসের নয় তারিখ কে’-আরাফা দিবস বলে।

ফেরেশতা জিব্রাইল (আ:) হজ্জের আমলসমূহ শিখিয়েছেন ইব্রাহীম (আ:) কে আরাফার ময়দানে। শেখানো শেষে ইব্রাহীম (আঃ) কে জিজ্ঞেস করে বলেছেন, ‘هل عرف -আপনি কি জানতে পেরেছেন?’। সেই থেকে আরাফার নাম ‘আরাফা’হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। আদম ও হাওয়া পৃথিবীতে আসার পর প্রথম পরিচয় হয় আরাফার ময়দানে বলেও একটি কথা আছে।আরাফা শব্দের এক অর্থ:পরিচয় লাভ করা,সে হিসেবেও আরাফার নাম আরাফা হয়ে থাকতে পারে।কারও কারও মতে,যেহেতু এ ময়দানে মানুষ,আল্লাহর দরবারে গুনাহ-পাপ স্বীকার করে থাকে,এখান থেকেও আরাফা নামটির উৎপত্তি হয়ে থাকতে পারে। কেননা عَرَفَ ধাতুরই রূপান্তরিত শব্দ اِعْتَرَفَ – ‘স্বীকার করেছে’। আরাফার ময়দান হেরেম এলাকার বাইরে অবস্থিত। কাবা শরীফ থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে, মসজিদুল হারাম রোড হয়ে ২২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আরাফার এই ময়দান।১০.৪ কি.মি. জায়গা জুড়ে বিস্তৃত আরাফার ময়দান। চতুর্দিকে সীমানা-নির্ধারণমূলক উঁচু ফলক রয়েছে।৯ জিলহজ্জ ভোরে ফজরের সালাত মিনায় আদায় করে সূর্যোদয়ের পর ‘তালবিয়া’ পড়া অবস্থায় রওয়ানা হতে হয় আরাফা অভিমুখে।তবে বর্তমানে হজ্জযাত্রীদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ফজরের পূর্বেই নিয়ে যাওয়া হয় আরাফায়।এটা নিশ্চয়ই সুন্নতের খেলাফ তবে সমস্যার কারণে এ সুন্নত ছুটে গেলে কোনো সমস্যা হবে না।

আল্লাহর কাছে সর্বোত্তম দিবস আরাফা দিবস।আল্লাহ তাআলা,আরাফা দিবসে,তাঁর বান্দাদেরকে সবচেয়ে বেশি জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন।
হাদিসে এসেছে,রাসূলুল্লাহ (ﷺ)বলেছেন,‘এমন কোনো দিবস নেই যেখানে আল্লাহ তাআলা আরাফা দিবস থেকে বেশি বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। এবং আল্লাহ নিশ্চয়ই নিকটবর্তী হন,ও তাদেরকে নিয়ে ফেরেশতাদের সাথে গর্ব করেন,বলেন—ওরা কী চায়?
সূত্র:[মুসলিম:হা/১৩৪৩]

অন্য এক হাদিসে এসেছে,‘আল্লাহ তাআলা আরাফায় অবস্থানরতদেরকে নিয়ে আকাশবাসীদের সাথে গর্ব করেন।তিনি বলেন,আমার বান্দাদের দিকে তাকিয়ে দেখো,তারা আমার কাছে এসেছে এলোথেলো ও ধুলায় আবৃত অবস্থায়।
সূত্র:[মুসনাদে আহমদ:২/২২৪]

★আরাফাহ দিবসের মর্যাদা…

(১)এ দিন ইসলাম ধর্মের পূর্ণতা লাভ ও বিশ্ব মুসলিমের প্রতি আল্লাহর নে‘মতের পরিপূর্ণতা প্রাপ্তির দিন। হাদীছে এসেছে-

عَنْ طَارِقِ بْنِ شِهَابٍ عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ أَنَّ رَجُلاً مِنَ الْيَهُودِ قَالَ لَهُ يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ، آيَةٌ فِى كِتَابِكُمْ تَقْرَءُونَهَا لَوْ عَلَيْنَا مَعْشَرَ الْيَهُودِ نَزَلَتْ لاَتَّخَذْنَا ذَلِكَ الْيَوْمَ عِيدًا. قَالَ أَىُّ آيَةٍ قَالَ (الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِى وَرَضِيتُ لَكُمُ الإِسْلاَمَ دِينًا). قَالَ عُمَرُ قَدْ عَرَفْنَا ذَلِكَ الْيَوْمَ وَالْمَكَانَ الَّذِى نَزَلَتْ فِيهِ عَلَى النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم وَهُوَ قَائِمٌ بِعَرَفَةَ يَوْمَ جُمُعَةٍ.

অনুবাদ:তারিক বিন শিহাব (রহঃ) হ’তে বর্ণিত, এক ইহুদী লোক ওমর (রাঃ)-কে বলল, হে আমীরুল মুমিনীন! আপনাদের কিতাবে আপনারা এমন একটি আয়াত তেলাওয়াত করে থাকেন যদি সে আয়াতটি আমাদের প্রতি অবতীর্ণ হ’ত তাহ’লে আমরা সে দিনটিকে ঈদ হিসাবে উদযাপন করতাম। তিনি বললেন, সে আয়াত কোনটি? লোকটি বলল, আয়াতটি হ’ল-
اَلْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِيْنَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِيْ وَرَضِيْتُ لَكُمُ الْإِسْلاَمَ دِيْنًا.
‘আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জীবন বিধান হিসাবে মনোনীত করলাম’(মায়েদাহ ৫/৩)। ওমর (রাঃ) এ কথা শুনে বললেন, আমি অবশ্যই জানি কখন তা অবতীর্ণ হয়েছে ও কোথায় অবতীর্ণ হয়েছে এবং অবতীর্ণ হওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কোথায় ছিলেন। সে দিনটি হ’ল জুম‘আর দিন। তিনি সে দিন আরাফার ময়দানে দাঁড়িয়ে ছিলেন’।
সূত্র:[বুখারী হা/৪৫, ৪৬০৬]

(২)এ দিন হ’ল ঈদের দিন সমূহের একটি দিন।আবু উমামাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত,রাসূলুল্লাহ (সা:) ইরশাদ করেছেন…

يَوْمُ عَرَفَةَ وَيَوْمُ النَّحْرِ وَأَيَّامُ التَّشْرِيْقِ عِيْدُنَا أَهْلَ الإِسْلاَمِ وَهِىَ أَيَّامُ أَكْلٍ وَشُرْبٍ-

অনুবাদ:‘আরাফাহ দিবস, কুরবানীর দিন ও আইয়ামে তাশরীক (কুরবানী পরবর্তী তিন দিন) আমাদের ইসলামের অনুসারীদের ঈদের দিন। আর এ দিনগুলো খাওয়া-দাওয়ার দিন’।
সূত্র:[আবুদাঊদ হা/২৪১৯]

ওমর (রাঃ) বর্ণিত হাদীছের ব্যাখ্যায় ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন, সূরা মায়েদার এ আয়াতটি নাযিল হয়েছে দু’টো ঈদের দিনে। তা হ’ল জুম‘আর দিন ও আরাফাহর দিন।
সূত্র:[জামে‘তিরমিযী,হা/২৪৩৮]

★আরাফাহ দিবসের গুরুত্ব ও ফযীলত…
১. আরাফাহ দিবসের সিয়াম দু’বছরের গোনাহের কাফফারা:আরাফার দিন সিয়াম পালন করলে এক বছর পূর্বের এবং এক বছর পরের গুনাহ মাফ হয়। আবু কাতাদাহ (রা:) থেকে বর্ণিত,রাসূলুল্লাহ (সা:)-কে আরাফাহ দিবসের সিয়াম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হ’লে তিনি বলেন,

صِيَامُ يَوْمِ عَرَفَةَ إِنِّى أَحْتَسِبُ عَلَى اللهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِى قَبْلَهُ وَالسَّنَةَ الَّتِى بَعْدَهُ-

অনুবাদ:‘আরাফার দিনের সিয়াম, আমি মনে করি বিগত এক বছর ও আগত এক বছরের গুনাহের কাফফারা হিসাবে গ্রহণ করা হয়ে থাকে’। সূত্র:[মুসলিম হা/১১৬৩]

২. আরাফার দিন গুনাহ মাফ ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভের দিন:এ দিনে আল্লাহ স্বীয় বান্দাদের মধ্য থেকে অধিক সংখ্যক মানুষকে ক্ষমা করে দিয়ে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন। আয়েশা (রা:) হ’তে বর্ণিত,রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেন,(সা:) ইরশাদ করেন…

مَا مِنْ يَوْمٍ أَكْثَرَ مِنْ أَنْ يُعْتِقَ اللهُ فِيهِ عَبْدًا مِنَ النَّارِ مِنْ يَوْمِ عَرَفَةَ وَإِنَّهُ لَيَدْنُو ثُمَّ يُبَاهِى بِهِمُ الْمَلاَئِكَةَ فَيَقُوْلُ مَا أَرَادَ هَؤُلاَءِ

অনুবাদ:‘আরাফার দিন আল্লাহ রাববুল আলামীন তাঁর বান্দাদের এত অধিক সংখ্যক জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন,যা অন্য দিনে দেন না। তিনি এ দিনে বান্দাদের নিকটবর্তী হন ও তাদের নিয়ে ফেরেশতাদের কাছে গর্ব করে বলেন,তোমরা কি বলতে পার আমার এ বান্দারা আমার কাছে কি চায়’?
সূত্র:[মুসলিম হা/১৩৪৮]

ইমাম নববী (রহ:)বলেন,এ হাদিসটি আরাফাহ দিবসের ফযীলতের একটি স্পষ্ট প্রমাণ।

★উল্লেখ্য…
উক্ত হাদীসে বর্ণিত ইয়াওমে আরাফা দ্বারা যিলহজ্বের নয় তারিখ উদ্দেশ্য। এই তারিখের পারিভাষিক নাম হচ্ছে ইয়াওমে আরাফা। কেননা এই রোযা আরাফার ময়দানের আমল নয় বরং আরাফার দিন তো হাজ্বীদের জন্য রোযা না রাখাই মুস্তাহাব। হাদিস শরীফে এসেছে…

عَنْ أُمِّ الْفَضْلِ بِنْتِ الْحَارِثِ،أَنّ نَاسًا تَمَارَوْا عِنْدَهَا يَوْمَ عَرَفَةَ، فِي صِيَامِ رَسُولِ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ، فَقَالَ بَعْضُهُمْ: هُوَ صَائِمٌ، وَقَالَ بَعْضُهُمْ: لَيْسَ بِصَائِمٍ، فَأَرْسَلْتُ إِلَيْهِ بِقَدَحِ لَبَنٍ، وَهُوَ وَاقِفٌ عَلَى بَعِيرِهِ بِعَرَفَةَ، فَشَرِبَهُ.

অনুবাদ:উম্মুল ফযল বিনতে হারেছ বলেন, তার নিকট কতক লোক ইয়াওমে আরাফায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রোযার ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করছিল। কেউ কেউ বলছিল, তিনি রোযা আছেন। আর কেউ কেউ বলছিল, তিনি রোযা নেই। উম্মুল ফযল একটি পেয়ালাতে দুধ পাঠালেন। নবীজী তখন উটের উপর ছিলেন। তিনি দুধ পান করলেন। সূত্র:[মুসলিম,হা/১১২৩]

আরাফার দিন আল্লাহর রাসূল রোযা রাখেননি। একারণে ফকীহগণ হাজ্বীদের জন্য আরাফার দিন রোযা না রাখা উত্তম বলেছেন। আবু কাতাদা রা.-এর হাদীস দ্বারা ইয়াওমে আরাফায় রোযা রাখা মুস্তাহাব প্রমাণিত হয়।

সুতরাং বুঝা গেল, আবু কাতাদাহ রা.-এর হাদীসে ‘ইয়াওমে আরাফা’ দ্বারা নয় যিলহজ্ব অর্থাৎ ঈদের আগের দিনই উদ্দেশ্য।

সুতরাং আমাদের দেশের চাঁদের হিসেবে যেদিন নয় তারিখ হয় সেদিনই রোযা রাখা হবে। সৌদির হিসাবে আরাফার দিন অনুযায়ী নয়। উল্লেখ্য,তাকবীরে তাশরীক সংক্রান্ত হাদীসেও ইয়াওমে আরাফা দ্বারা নয় যিলহজ্বই উদ্দেশ্য। কেননা এ আমলও আরাফার সাথে নির্দিষ্ট কোনো আমল নয়।

ইয়াওমে আরাফা’ অর্থ নয় জিলহজ্ব। এটিই সঠিক ব্যাখ্যা। কারণ এই রোযা আরাফা বা উকুফে আরাফার আমল নয়;তা ঐ তারিখের আমল। ‘ইয়াওমে আরাফা’ হচ্ছে ঐ তারিখের (নয় যিলহজ্বের) পারিভাষিক নাম। যেহেতু ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ রোকন হজ্বের প্রধান রোকন উকুফে আরাফা ঐ স্থানের তারিখ হিসাবে নয় যিলহজ্বে আদায় করা হয় তাই এ তারিখেরই নাম পড়ে গেছে ‘ইয়াওমে আরাফা’।একারণে যেসব আমল আরাফা বা উকূফে আরাফার সাথে বিশেষভাবে সংশ্লিষ্ট নয়;বরং যিলহজ্বের নয় তারিখের সাথে সংশ্লিষ্ট,সেগুলোকেও ‘ইয়াওমে আরাফা’র আমল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। উদ্দেশ্য,নয় তারিখে বা ঈদের আগের দিন আমলটি করতে হবে। গোটা মুসলিম উম্মাহর ইজমা আছে যে, ইয়াওমে আরাফার পরের দিনটিই ইয়াওমুন নাহর।

এটি প্রমাণ করে, ‘ইয়াওমে আরাফা’একটি তারিখের নাম,আর তা হচ্ছে নয় যিলহজ্ব,যেমন ‘ইয়াওমুন নাহর’একটি তারিখের নাম,আর তা হচ্ছে দশ যিলহজ্ব। কোনো অঞ্চলের অধিবাসীরা যদি ঐ অঞ্চলের তারিখ অনুযায়ী ইয়াওমুন নাহরের অর্থ দশ জিলহজ্ব ধরে ইয়াওমে আরাফার এমন কোনো অর্থ করেন, যদ্বারা সেখানের তারিখ হিসেবে তা হয়ে যায় আট যিলহজ্ব, তাহলে সেটা হবে এক উদ্ভট,হাস্যকর ও ইজমা বিরোধী কথা। কারণ ইয়াওমে আরাফা ও ইয়াওমুন নাহরের মাঝে আরেকটি দিন স্বীকার করে নেওয়া ইজমার সরাসরি বিরোধী।

★পরিশেষে বলতে চাই… আরাফার দিনটি আমাদের জীবনে একটি বোনাস বা উপহারের মতো। মাত্র একটি দিনের রোজার মাধ্যমে দুই বছরের গুনাহ থেকে পবিত্র হওয়ার এমন সুবর্ণ সুযোগ ইসলামে আর দ্বিতীয়টি নেই। তাই ২০২৬ সালের এই মহিমান্বিত দিনটিতে বিতর্ক এড়িয়ে সর্বোচ্চ ফায়দা লুটতে আমাদের উচিত ইবাদত,জিকির ও আরাফার দিনের দোয়া পাঠে মশগুল থাকা। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই পবিত্র দিনের পরিপূর্ণ রহমত ও বরকত লাভের তৌফিক দান করুন। আমিন।

Tag :
About Author Information

জনপ্রিয়

বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সাভারে বৃক্ষরোপণ ও বিতরণ কর্মসূচি

আরাফার দিবসের গুরুত্ব ও ফজিলত

প্রকাশের সময়ঃ ০৪:২৩:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬

 

✍️মাওলানা শেখ মিলাদ হোসাইন সিদ্দিকীঃ ভূমিকা:জিলহজ্জ মাসের নয় তারিখ কে’-আরাফা দিবস বলে।

ফেরেশতা জিব্রাইল (আ:) হজ্জের আমলসমূহ শিখিয়েছেন ইব্রাহীম (আ:) কে আরাফার ময়দানে। শেখানো শেষে ইব্রাহীম (আঃ) কে জিজ্ঞেস করে বলেছেন, ‘هل عرف -আপনি কি জানতে পেরেছেন?’। সেই থেকে আরাফার নাম ‘আরাফা’হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। আদম ও হাওয়া পৃথিবীতে আসার পর প্রথম পরিচয় হয় আরাফার ময়দানে বলেও একটি কথা আছে।আরাফা শব্দের এক অর্থ:পরিচয় লাভ করা,সে হিসেবেও আরাফার নাম আরাফা হয়ে থাকতে পারে।কারও কারও মতে,যেহেতু এ ময়দানে মানুষ,আল্লাহর দরবারে গুনাহ-পাপ স্বীকার করে থাকে,এখান থেকেও আরাফা নামটির উৎপত্তি হয়ে থাকতে পারে। কেননা عَرَفَ ধাতুরই রূপান্তরিত শব্দ اِعْتَرَفَ – ‘স্বীকার করেছে’। আরাফার ময়দান হেরেম এলাকার বাইরে অবস্থিত। কাবা শরীফ থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে, মসজিদুল হারাম রোড হয়ে ২২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আরাফার এই ময়দান।১০.৪ কি.মি. জায়গা জুড়ে বিস্তৃত আরাফার ময়দান। চতুর্দিকে সীমানা-নির্ধারণমূলক উঁচু ফলক রয়েছে।৯ জিলহজ্জ ভোরে ফজরের সালাত মিনায় আদায় করে সূর্যোদয়ের পর ‘তালবিয়া’ পড়া অবস্থায় রওয়ানা হতে হয় আরাফা অভিমুখে।তবে বর্তমানে হজ্জযাত্রীদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ফজরের পূর্বেই নিয়ে যাওয়া হয় আরাফায়।এটা নিশ্চয়ই সুন্নতের খেলাফ তবে সমস্যার কারণে এ সুন্নত ছুটে গেলে কোনো সমস্যা হবে না।

আল্লাহর কাছে সর্বোত্তম দিবস আরাফা দিবস।আল্লাহ তাআলা,আরাফা দিবসে,তাঁর বান্দাদেরকে সবচেয়ে বেশি জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন।
হাদিসে এসেছে,রাসূলুল্লাহ (ﷺ)বলেছেন,‘এমন কোনো দিবস নেই যেখানে আল্লাহ তাআলা আরাফা দিবস থেকে বেশি বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। এবং আল্লাহ নিশ্চয়ই নিকটবর্তী হন,ও তাদেরকে নিয়ে ফেরেশতাদের সাথে গর্ব করেন,বলেন—ওরা কী চায়?
সূত্র:[মুসলিম:হা/১৩৪৩]

অন্য এক হাদিসে এসেছে,‘আল্লাহ তাআলা আরাফায় অবস্থানরতদেরকে নিয়ে আকাশবাসীদের সাথে গর্ব করেন।তিনি বলেন,আমার বান্দাদের দিকে তাকিয়ে দেখো,তারা আমার কাছে এসেছে এলোথেলো ও ধুলায় আবৃত অবস্থায়।
সূত্র:[মুসনাদে আহমদ:২/২২৪]

★আরাফাহ দিবসের মর্যাদা…

(১)এ দিন ইসলাম ধর্মের পূর্ণতা লাভ ও বিশ্ব মুসলিমের প্রতি আল্লাহর নে‘মতের পরিপূর্ণতা প্রাপ্তির দিন। হাদীছে এসেছে-

عَنْ طَارِقِ بْنِ شِهَابٍ عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ أَنَّ رَجُلاً مِنَ الْيَهُودِ قَالَ لَهُ يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ، آيَةٌ فِى كِتَابِكُمْ تَقْرَءُونَهَا لَوْ عَلَيْنَا مَعْشَرَ الْيَهُودِ نَزَلَتْ لاَتَّخَذْنَا ذَلِكَ الْيَوْمَ عِيدًا. قَالَ أَىُّ آيَةٍ قَالَ (الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِى وَرَضِيتُ لَكُمُ الإِسْلاَمَ دِينًا). قَالَ عُمَرُ قَدْ عَرَفْنَا ذَلِكَ الْيَوْمَ وَالْمَكَانَ الَّذِى نَزَلَتْ فِيهِ عَلَى النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم وَهُوَ قَائِمٌ بِعَرَفَةَ يَوْمَ جُمُعَةٍ.

অনুবাদ:তারিক বিন শিহাব (রহঃ) হ’তে বর্ণিত, এক ইহুদী লোক ওমর (রাঃ)-কে বলল, হে আমীরুল মুমিনীন! আপনাদের কিতাবে আপনারা এমন একটি আয়াত তেলাওয়াত করে থাকেন যদি সে আয়াতটি আমাদের প্রতি অবতীর্ণ হ’ত তাহ’লে আমরা সে দিনটিকে ঈদ হিসাবে উদযাপন করতাম। তিনি বললেন, সে আয়াত কোনটি? লোকটি বলল, আয়াতটি হ’ল-
اَلْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِيْنَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِيْ وَرَضِيْتُ لَكُمُ الْإِسْلاَمَ دِيْنًا.
‘আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জীবন বিধান হিসাবে মনোনীত করলাম’(মায়েদাহ ৫/৩)। ওমর (রাঃ) এ কথা শুনে বললেন, আমি অবশ্যই জানি কখন তা অবতীর্ণ হয়েছে ও কোথায় অবতীর্ণ হয়েছে এবং অবতীর্ণ হওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কোথায় ছিলেন। সে দিনটি হ’ল জুম‘আর দিন। তিনি সে দিন আরাফার ময়দানে দাঁড়িয়ে ছিলেন’।
সূত্র:[বুখারী হা/৪৫, ৪৬০৬]

(২)এ দিন হ’ল ঈদের দিন সমূহের একটি দিন।আবু উমামাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত,রাসূলুল্লাহ (সা:) ইরশাদ করেছেন…

يَوْمُ عَرَفَةَ وَيَوْمُ النَّحْرِ وَأَيَّامُ التَّشْرِيْقِ عِيْدُنَا أَهْلَ الإِسْلاَمِ وَهِىَ أَيَّامُ أَكْلٍ وَشُرْبٍ-

অনুবাদ:‘আরাফাহ দিবস, কুরবানীর দিন ও আইয়ামে তাশরীক (কুরবানী পরবর্তী তিন দিন) আমাদের ইসলামের অনুসারীদের ঈদের দিন। আর এ দিনগুলো খাওয়া-দাওয়ার দিন’।
সূত্র:[আবুদাঊদ হা/২৪১৯]

ওমর (রাঃ) বর্ণিত হাদীছের ব্যাখ্যায় ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন, সূরা মায়েদার এ আয়াতটি নাযিল হয়েছে দু’টো ঈদের দিনে। তা হ’ল জুম‘আর দিন ও আরাফাহর দিন।
সূত্র:[জামে‘তিরমিযী,হা/২৪৩৮]

★আরাফাহ দিবসের গুরুত্ব ও ফযীলত…
১. আরাফাহ দিবসের সিয়াম দু’বছরের গোনাহের কাফফারা:আরাফার দিন সিয়াম পালন করলে এক বছর পূর্বের এবং এক বছর পরের গুনাহ মাফ হয়। আবু কাতাদাহ (রা:) থেকে বর্ণিত,রাসূলুল্লাহ (সা:)-কে আরাফাহ দিবসের সিয়াম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হ’লে তিনি বলেন,

صِيَامُ يَوْمِ عَرَفَةَ إِنِّى أَحْتَسِبُ عَلَى اللهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِى قَبْلَهُ وَالسَّنَةَ الَّتِى بَعْدَهُ-

অনুবাদ:‘আরাফার দিনের সিয়াম, আমি মনে করি বিগত এক বছর ও আগত এক বছরের গুনাহের কাফফারা হিসাবে গ্রহণ করা হয়ে থাকে’। সূত্র:[মুসলিম হা/১১৬৩]

২. আরাফার দিন গুনাহ মাফ ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভের দিন:এ দিনে আল্লাহ স্বীয় বান্দাদের মধ্য থেকে অধিক সংখ্যক মানুষকে ক্ষমা করে দিয়ে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন। আয়েশা (রা:) হ’তে বর্ণিত,রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেন,(সা:) ইরশাদ করেন…

مَا مِنْ يَوْمٍ أَكْثَرَ مِنْ أَنْ يُعْتِقَ اللهُ فِيهِ عَبْدًا مِنَ النَّارِ مِنْ يَوْمِ عَرَفَةَ وَإِنَّهُ لَيَدْنُو ثُمَّ يُبَاهِى بِهِمُ الْمَلاَئِكَةَ فَيَقُوْلُ مَا أَرَادَ هَؤُلاَءِ

অনুবাদ:‘আরাফার দিন আল্লাহ রাববুল আলামীন তাঁর বান্দাদের এত অধিক সংখ্যক জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন,যা অন্য দিনে দেন না। তিনি এ দিনে বান্দাদের নিকটবর্তী হন ও তাদের নিয়ে ফেরেশতাদের কাছে গর্ব করে বলেন,তোমরা কি বলতে পার আমার এ বান্দারা আমার কাছে কি চায়’?
সূত্র:[মুসলিম হা/১৩৪৮]

ইমাম নববী (রহ:)বলেন,এ হাদিসটি আরাফাহ দিবসের ফযীলতের একটি স্পষ্ট প্রমাণ।

★উল্লেখ্য…
উক্ত হাদীসে বর্ণিত ইয়াওমে আরাফা দ্বারা যিলহজ্বের নয় তারিখ উদ্দেশ্য। এই তারিখের পারিভাষিক নাম হচ্ছে ইয়াওমে আরাফা। কেননা এই রোযা আরাফার ময়দানের আমল নয় বরং আরাফার দিন তো হাজ্বীদের জন্য রোযা না রাখাই মুস্তাহাব। হাদিস শরীফে এসেছে…

عَنْ أُمِّ الْفَضْلِ بِنْتِ الْحَارِثِ،أَنّ نَاسًا تَمَارَوْا عِنْدَهَا يَوْمَ عَرَفَةَ، فِي صِيَامِ رَسُولِ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ، فَقَالَ بَعْضُهُمْ: هُوَ صَائِمٌ، وَقَالَ بَعْضُهُمْ: لَيْسَ بِصَائِمٍ، فَأَرْسَلْتُ إِلَيْهِ بِقَدَحِ لَبَنٍ، وَهُوَ وَاقِفٌ عَلَى بَعِيرِهِ بِعَرَفَةَ، فَشَرِبَهُ.

অনুবাদ:উম্মুল ফযল বিনতে হারেছ বলেন, তার নিকট কতক লোক ইয়াওমে আরাফায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রোযার ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করছিল। কেউ কেউ বলছিল, তিনি রোযা আছেন। আর কেউ কেউ বলছিল, তিনি রোযা নেই। উম্মুল ফযল একটি পেয়ালাতে দুধ পাঠালেন। নবীজী তখন উটের উপর ছিলেন। তিনি দুধ পান করলেন। সূত্র:[মুসলিম,হা/১১২৩]

আরাফার দিন আল্লাহর রাসূল রোযা রাখেননি। একারণে ফকীহগণ হাজ্বীদের জন্য আরাফার দিন রোযা না রাখা উত্তম বলেছেন। আবু কাতাদা রা.-এর হাদীস দ্বারা ইয়াওমে আরাফায় রোযা রাখা মুস্তাহাব প্রমাণিত হয়।

সুতরাং বুঝা গেল, আবু কাতাদাহ রা.-এর হাদীসে ‘ইয়াওমে আরাফা’ দ্বারা নয় যিলহজ্ব অর্থাৎ ঈদের আগের দিনই উদ্দেশ্য।

সুতরাং আমাদের দেশের চাঁদের হিসেবে যেদিন নয় তারিখ হয় সেদিনই রোযা রাখা হবে। সৌদির হিসাবে আরাফার দিন অনুযায়ী নয়। উল্লেখ্য,তাকবীরে তাশরীক সংক্রান্ত হাদীসেও ইয়াওমে আরাফা দ্বারা নয় যিলহজ্বই উদ্দেশ্য। কেননা এ আমলও আরাফার সাথে নির্দিষ্ট কোনো আমল নয়।

ইয়াওমে আরাফা’ অর্থ নয় জিলহজ্ব। এটিই সঠিক ব্যাখ্যা। কারণ এই রোযা আরাফা বা উকুফে আরাফার আমল নয়;তা ঐ তারিখের আমল। ‘ইয়াওমে আরাফা’ হচ্ছে ঐ তারিখের (নয় যিলহজ্বের) পারিভাষিক নাম। যেহেতু ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ রোকন হজ্বের প্রধান রোকন উকুফে আরাফা ঐ স্থানের তারিখ হিসাবে নয় যিলহজ্বে আদায় করা হয় তাই এ তারিখেরই নাম পড়ে গেছে ‘ইয়াওমে আরাফা’।একারণে যেসব আমল আরাফা বা উকূফে আরাফার সাথে বিশেষভাবে সংশ্লিষ্ট নয়;বরং যিলহজ্বের নয় তারিখের সাথে সংশ্লিষ্ট,সেগুলোকেও ‘ইয়াওমে আরাফা’র আমল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। উদ্দেশ্য,নয় তারিখে বা ঈদের আগের দিন আমলটি করতে হবে। গোটা মুসলিম উম্মাহর ইজমা আছে যে, ইয়াওমে আরাফার পরের দিনটিই ইয়াওমুন নাহর।

এটি প্রমাণ করে, ‘ইয়াওমে আরাফা’একটি তারিখের নাম,আর তা হচ্ছে নয় যিলহজ্ব,যেমন ‘ইয়াওমুন নাহর’একটি তারিখের নাম,আর তা হচ্ছে দশ যিলহজ্ব। কোনো অঞ্চলের অধিবাসীরা যদি ঐ অঞ্চলের তারিখ অনুযায়ী ইয়াওমুন নাহরের অর্থ দশ জিলহজ্ব ধরে ইয়াওমে আরাফার এমন কোনো অর্থ করেন, যদ্বারা সেখানের তারিখ হিসেবে তা হয়ে যায় আট যিলহজ্ব, তাহলে সেটা হবে এক উদ্ভট,হাস্যকর ও ইজমা বিরোধী কথা। কারণ ইয়াওমে আরাফা ও ইয়াওমুন নাহরের মাঝে আরেকটি দিন স্বীকার করে নেওয়া ইজমার সরাসরি বিরোধী।

★পরিশেষে বলতে চাই… আরাফার দিনটি আমাদের জীবনে একটি বোনাস বা উপহারের মতো। মাত্র একটি দিনের রোজার মাধ্যমে দুই বছরের গুনাহ থেকে পবিত্র হওয়ার এমন সুবর্ণ সুযোগ ইসলামে আর দ্বিতীয়টি নেই। তাই ২০২৬ সালের এই মহিমান্বিত দিনটিতে বিতর্ক এড়িয়ে সর্বোচ্চ ফায়দা লুটতে আমাদের উচিত ইবাদত,জিকির ও আরাফার দিনের দোয়া পাঠে মশগুল থাকা। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই পবিত্র দিনের পরিপূর্ণ রহমত ও বরকত লাভের তৌফিক দান করুন। আমিন।