
মৌলভীবাজারঃ পাহাড়ি ছড়া বেয়ে নেমে আসা স্বচ্ছ জলের স্রোত একসময় শ্রীমঙ্গলের প্রকৃতির প্রাণ ছিল। সেই ছড়ার বুকেই আজ জমে আছে পলিথিন, প্লাস্টিক আর নানা অপচনশীল বর্জ্যের স্তূপ। প্রতিদিন সেসব ভেসে যাচ্ছে হাইল হাওরের দিকে। নিঃশব্দে, ধীরে ধীরে, কিন্তু ভয়াবহ পরিণতির বার্তা নিয়ে।
এই বাস্তবতা চোখে পড়তেই উদ্যোগী হয়েছেন মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো: হাজী মুজিবুর রহমান চৌধুরী (হাজী মুজিব)। শুক্রবার সকালে শ্রীমঙ্গলের ভুরভুরিয়া ছড়ার পাড়ে দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা দেন পলিথিন ও প্লাস্টিকবিরোধী ধারাবাহিক অভিযানের। তার কণ্ঠে ছিল উদ্বেগ, আবার ছিল প্রত্যয়ের দৃঢ়তা-“এখনই বন্ধ করতে না পারলে হাওরের বাকি অংশও হয়তো রক্ষা করা যাবে না।”
স্থানীয়দের ভাষ্য, ভুরভুরিয়া ছড়াসহ আশপাশের বিভিন্ন জলপথ দিয়ে প্রতিদিন টন টন বর্জ্য গিয়ে পড়ছে হাইল হাওর-এ। খাল-বিল ভরাট হয়ে যাচ্ছে, কমছে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ। বোরো জমির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে, ঝুঁকিতে পড়ছে দেশীয় প্রজাতির মাছের আবাসস্থল। প্রকৃতি যেন নীরবে দিচ্ছে ‘রেড অ্যালার্ট’।
এই প্রেক্ষাপটে উপজেলা প্রশাসন ও পৌরসভার সঙ্গে আলোচনা করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। গঠন করা হচ্ছে সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিচালনা কমিটি, যারা নিয়মিত মনিটরিং ও অপসারণ কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
অভিযানে প্রশাসন ও জনতা
উদ্বোধনী আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি), থানা পুলিশ, পৌরসভার প্রকৌশলী, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, স্কাউট ও বিএনসিসি সদস্য, গণমাধ্যমকর্মী এবং সচেতন নাগরিকেরা। ছড়ার পাড়ে দাঁড়িয়ে তারা দেখেছেন জমে থাকা প্লাস্টিকের স্তূপ। যা একদিনে তৈরি হয়নি, কিন্তু একদিনেই বদলানোও সম্ভব নয়।
সংসদ সদস্য বলেন, “কাজটি কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। আমরা যদি সবাই আন্তরিক হই, তবে লক্ষ্য অর্জন করবোই।”
ঘরে ঘরে সচেতনতার বার্তা
শুধু বর্জ্য অপসারণ নয়, সচেতনতা তৈরিও এ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য। শহরতলীর পরিবারগুলোর মাঝে তিনি নিজ উদ্যোগে বারবার ব্যবহারযোগ্য ব্যাগ বিতরণ করেন। অনুরোধ জানান, প্লাস্টিক ছড়া বা ড্রেনে নয়, আলাদা করে জমা রাখতে। প্রয়োজনে বিক্রি করতে অথবা পৌরসভার নির্ধারিত ব্যবস্থায় দিতে।
তার ভাষায়, “শ্রীমঙ্গল একটি পর্যটন নগরী। পরিচ্ছন্নতা শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, আমাদের ভবিষ্যতের জন্যও জরুরি।”
নির্বাচনের পর ব্যতিক্রমী পথচলা
নির্বাচনে বিজয়ের পর থেকেই তিনি ব্যতিক্রমী কর্মতৎপরতায় আলোচনায়। শপথ শেষে এলাকায় ফিরে ফুলেল শুভেচ্ছা গ্রহণ করে তা জনগণকেই ফিরিয়ে দেওয়া, সড়ক নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ, চা শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলা, হাসপাতালে গিয়ে রোগীদের খোঁজখবর নেওয়া। এসব উদ্যোগে ফুটে উঠেছে মাঠমুখী রাজনীতির এক ভিন্ন চিত্র। এবার সেই ধারাবাহিকতায় যুক্ত হলো পরিবেশ রক্ষার লড়াই।
প্রকৃতির পক্ষে সম্মিলিত অঙ্গীকার
শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া এ পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলমান থাকবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন সংসদ সদস্য। বিশেষ করে পাহাড়ি ছড়ার পাড়ে বসবাসকারীদের প্রতি তার আহ্বান “আপনারা বর্জ্য পানিতে ফেলবেন না। সামান্য সচেতনতা আমাদের হাওরকে বাঁচাতে পারে।”
প্রকৃতির বিরুদ্ধে নয়, প্রকৃতির পক্ষে এই অভিযাত্রা কতটা সফল হবে। তা নির্ভর করছে প্রশাসনের উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিকদের দায়িত্ববোধের ওপর। তবে ভুরভুরিয়া ছড়ার পাড়ে দাঁড়িয়ে যে অঙ্গীকার উচ্চারিত হয়েছে, তা শ্রীমঙ্গলের আকাশে এক নতুন প্রত্যয়ের বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছে।
মো বদরুজ্জামান রুহেল 


















