০৯:৩৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঠান্ডায় গবাদি পশু পালনে হিমশিম খাচ্ছেন রংপুর অঞ্চলের কৃষকরা

 

রংপুরঃ দীর্ঘস্থায়ী শৈত্যপ্রবাহ ও ঘন কুয়াশার কারণে দেশের উত্তরাঞ্চল রংপুর অঞ্চলে গবাদি পশু পালনে চরম সংকটে পড়েছেন কৃষকরা। পর্যাপ্ত খাদ্যের অভাবে গবাদি পশুরা অপুষ্টিতে ভুগছে, পাশাপাশি তীব্র ঠান্ডার কারণে পশুরা ঠিকমতো খাবার ও পানি পান করতেও পারছে না, জানান কৃষকরা।

তারা জানান, বিভিন্ন এলাকায় ঠান্ডাজনিত নানা রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, যার মধ্যে ক্ষুরা রোগও রয়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে গরু ও মহিষ পর্যাপ্ত খাদ্য না পাওয়ায় দুধের উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার কলোনীপাড়া গ্রামের কৃষক আজগর আলী (৬০) জানান, তার ছয়টি গরু রয়েছে। কিন্তু শৈত্যপ্রবাহ ও কুয়াশার কারণে সেগুলো লালন-পালনে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘ঠান্ডার কারণে গরুগুলো ঠিকমতো খাবার খেতে চায় না। এভাবে আরও কয়েকদিন শৈত্যপ্রবাহ চললে গরুগুলো অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে।’

লালমনিরহাট সদর উপজেলার ধরলা নদীর চরাঞ্চলের চর কুলাঘাট গ্রামের কৃষক আবদুল কাদের (৬৫) বলেন, ঠান্ডা ও কুয়াশার কারণে তিনি তার ছয়টি গরু ও আটটি ছাগল ঠিকমতো খাওয়াতে পারছেন না।
তিনি বলেন, ‘ঠান্ডার কারণে গবাদি পশুগুলো ঠিকভাবে পানি পান করতে পারছে না। গরুগুলো কাশি ও জ্বরে ভুগছে।’
তিনি আরও জানান, গত তিন মাস ধরে তার ছয়টি গরুর মধ্যে মাত্র তিনটি গরু দুধ দিচ্ছে। ‘আগে এই তিনটি গরু থেকে প্রতিদিন গড়ে নয় লিটার দুধ পেতাম। এখন পাচ্ছি মাত্র তিন থেকে চার লিটার,’ বলেন তিনি।

কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদের চরাঞ্চলের চর জোড়গাছ গ্রামের কৃষক শামসুর রহমান (৫৫) জানান, ঠান্ডার কারণে তার গবাদি পশুগুলো ক্ষুরা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমার চারটি গরুর মধ্যে একটি এই রোগে আক্রান্ত হয়েছে। চিকিৎসা দিচ্ছি, কিন্তু তেমন কাজ হচ্ছে না।’ ‘ঠান্ডা ও কুয়াশার কারণে তিনি তার চারটি গরু, দুটি মহিষ ও ছয়টি ছাগল মাঠে চড়াতে নিতে পারছেন না। ফলে বাড়িতে কিনে আনা খাবার খাওয়াতে হচ্ছে,’ তিনি জানান।
‘এভাবে আরও কয়েকদিন ঠান্ডা আর কুয়াশা থাকলে আমাদের গবাদি পশুগুলো মারা যেতে পারে,’ বলেন তিনি।

রংপুরের পীরগাছা উপজেলার অন্নদানগর গ্রামের কৃষক রজনীকান্ত রায় (৬৫) বলেন, ‘ঠান্ডা আর ঘন কুয়াশার কারণে আমরা নিজেরাই স্থবির হয়ে পড়েছি। আমাদের গবাদি পশু আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গরু, ছাগল, ভেড়া ও মহিষ ঠিকমতো পানি ও খাবার খেতে পারছে না।’ ‘ঠান্ডা থেকে রক্ষা করতে গবাদি পশুগুলোর গায়ে বস্তা চাপাতে হচ্ছে ‘ তিনি বলেন।
তিনি আরও বলেন, ‘আমার ১০টি গরু, ১৫টি ছাগল ও চারটি ভেড়া রয়েছে। আমরা মারাত্মক বিপাকে আছি। এভাবে ঠান্ডা ও কুয়াশা চলতে থাকলে গবাদি পশুগুলো অসুস্থ হয়ে পড়বে।’

রংপুর বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর বিভাগে মোট গবাদি পশুর সংখ্যা এক কোটি ৪৩ লাখ ৩৫ হাজার। এর মধ্যে ৬৯ লাখ গরু, ৬৭ লাখ ছাগল, সাত লাখ ভেড়া এবং ৩৫ হাজার মহিষ রয়েছে। এ অঞ্চলে প্রায় ১০ লাখ পরিবার গবাদি পশু পালন করে জীবিকা নির্বাহ করছে।

রংপুর বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আবদুল হাই সরকার বলেন, চলমান শৈত্যপ্রবাহ ও কুয়াশার কারণে কৃষকরা গবাদি পশু পালনে সমস্যায় পড়ছেন, তবে এখনো ক্ষুরা রোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। ‘গবাদি পশুর মধ্যে ঠান্ডাজনিত জ্বর ও কাশির উপসর্গ দেখা যাচ্ছে, তবে সেগুলোর যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’

তিনি পরামর্শ দেন, গরু ও মহিষকে শীতবস্ত্র, বিশেষ করে পাটের বস্তা দিয়ে ঢেকে রাখা এবং গোয়ালঘর পলিথিন দিয়ে ঘিরে রাখলে গবাদি পশুকে ঠান্ডার প্রভাব থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

Tag :
About Author Information

জনপ্রিয়

মহম্মদপুরে সাবেক জাতীয় ফুটবলারদের প্রীতি ম্যাচ, ১-০ গোলে জয়ী সোনালী অতীত ক্লাব

ঠান্ডায় গবাদি পশু পালনে হিমশিম খাচ্ছেন রংপুর অঞ্চলের কৃষকরা

প্রকাশের সময়ঃ ০৩:৪২:১৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ জানুয়ারী ২০২৬

 

রংপুরঃ দীর্ঘস্থায়ী শৈত্যপ্রবাহ ও ঘন কুয়াশার কারণে দেশের উত্তরাঞ্চল রংপুর অঞ্চলে গবাদি পশু পালনে চরম সংকটে পড়েছেন কৃষকরা। পর্যাপ্ত খাদ্যের অভাবে গবাদি পশুরা অপুষ্টিতে ভুগছে, পাশাপাশি তীব্র ঠান্ডার কারণে পশুরা ঠিকমতো খাবার ও পানি পান করতেও পারছে না, জানান কৃষকরা।

তারা জানান, বিভিন্ন এলাকায় ঠান্ডাজনিত নানা রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, যার মধ্যে ক্ষুরা রোগও রয়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে গরু ও মহিষ পর্যাপ্ত খাদ্য না পাওয়ায় দুধের উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার কলোনীপাড়া গ্রামের কৃষক আজগর আলী (৬০) জানান, তার ছয়টি গরু রয়েছে। কিন্তু শৈত্যপ্রবাহ ও কুয়াশার কারণে সেগুলো লালন-পালনে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘ঠান্ডার কারণে গরুগুলো ঠিকমতো খাবার খেতে চায় না। এভাবে আরও কয়েকদিন শৈত্যপ্রবাহ চললে গরুগুলো অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে।’

লালমনিরহাট সদর উপজেলার ধরলা নদীর চরাঞ্চলের চর কুলাঘাট গ্রামের কৃষক আবদুল কাদের (৬৫) বলেন, ঠান্ডা ও কুয়াশার কারণে তিনি তার ছয়টি গরু ও আটটি ছাগল ঠিকমতো খাওয়াতে পারছেন না।
তিনি বলেন, ‘ঠান্ডার কারণে গবাদি পশুগুলো ঠিকভাবে পানি পান করতে পারছে না। গরুগুলো কাশি ও জ্বরে ভুগছে।’
তিনি আরও জানান, গত তিন মাস ধরে তার ছয়টি গরুর মধ্যে মাত্র তিনটি গরু দুধ দিচ্ছে। ‘আগে এই তিনটি গরু থেকে প্রতিদিন গড়ে নয় লিটার দুধ পেতাম। এখন পাচ্ছি মাত্র তিন থেকে চার লিটার,’ বলেন তিনি।

কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদের চরাঞ্চলের চর জোড়গাছ গ্রামের কৃষক শামসুর রহমান (৫৫) জানান, ঠান্ডার কারণে তার গবাদি পশুগুলো ক্ষুরা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমার চারটি গরুর মধ্যে একটি এই রোগে আক্রান্ত হয়েছে। চিকিৎসা দিচ্ছি, কিন্তু তেমন কাজ হচ্ছে না।’ ‘ঠান্ডা ও কুয়াশার কারণে তিনি তার চারটি গরু, দুটি মহিষ ও ছয়টি ছাগল মাঠে চড়াতে নিতে পারছেন না। ফলে বাড়িতে কিনে আনা খাবার খাওয়াতে হচ্ছে,’ তিনি জানান।
‘এভাবে আরও কয়েকদিন ঠান্ডা আর কুয়াশা থাকলে আমাদের গবাদি পশুগুলো মারা যেতে পারে,’ বলেন তিনি।

রংপুরের পীরগাছা উপজেলার অন্নদানগর গ্রামের কৃষক রজনীকান্ত রায় (৬৫) বলেন, ‘ঠান্ডা আর ঘন কুয়াশার কারণে আমরা নিজেরাই স্থবির হয়ে পড়েছি। আমাদের গবাদি পশু আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গরু, ছাগল, ভেড়া ও মহিষ ঠিকমতো পানি ও খাবার খেতে পারছে না।’ ‘ঠান্ডা থেকে রক্ষা করতে গবাদি পশুগুলোর গায়ে বস্তা চাপাতে হচ্ছে ‘ তিনি বলেন।
তিনি আরও বলেন, ‘আমার ১০টি গরু, ১৫টি ছাগল ও চারটি ভেড়া রয়েছে। আমরা মারাত্মক বিপাকে আছি। এভাবে ঠান্ডা ও কুয়াশা চলতে থাকলে গবাদি পশুগুলো অসুস্থ হয়ে পড়বে।’

রংপুর বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর বিভাগে মোট গবাদি পশুর সংখ্যা এক কোটি ৪৩ লাখ ৩৫ হাজার। এর মধ্যে ৬৯ লাখ গরু, ৬৭ লাখ ছাগল, সাত লাখ ভেড়া এবং ৩৫ হাজার মহিষ রয়েছে। এ অঞ্চলে প্রায় ১০ লাখ পরিবার গবাদি পশু পালন করে জীবিকা নির্বাহ করছে।

রংপুর বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আবদুল হাই সরকার বলেন, চলমান শৈত্যপ্রবাহ ও কুয়াশার কারণে কৃষকরা গবাদি পশু পালনে সমস্যায় পড়ছেন, তবে এখনো ক্ষুরা রোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। ‘গবাদি পশুর মধ্যে ঠান্ডাজনিত জ্বর ও কাশির উপসর্গ দেখা যাচ্ছে, তবে সেগুলোর যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’

তিনি পরামর্শ দেন, গরু ও মহিষকে শীতবস্ত্র, বিশেষ করে পাটের বস্তা দিয়ে ঢেকে রাখা এবং গোয়ালঘর পলিথিন দিয়ে ঘিরে রাখলে গবাদি পশুকে ঠান্ডার প্রভাব থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।