
লালমনিরহাটঃ কৃষক আবদার হোসেন (৬৫) চরম হতাশা নিয়ে বসে আছেন তিস্তার বুকে জেগে ওঠা বালুচরে। লালমনিরহাট সদর উপজেলার চর কালমাটি এলাকার এই কৃষকের চোখের সামনে তিস্তা নদী গিলে খেয়েছে তার ১৬ বিঘা আবাদি জমি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তার একটাই স্বপ্ন—‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়ন হলে হয়তো হারানো জমি ফিরে পাবেন, স্বাভাবিক গতি ফিরে পাবে তার জীবন-জীবিকা। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজ অনিশ্চয়তায় ঢাকা।
আবদার হোসেন বলেন, “৩–৪ মাস আগে শুনেছিলাম চলতি জানুয়ারি মাসেই তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু হবে। আমরা ভেবেছিলাম এবার সত্যিই কিছু হবে। কিন্তু কিছুই হলো না। এখন শুনছি, আপাতত কাজই শুরু হচ্ছে না। কবে হবে—এটার কোনো উত্তর কেউ দিতে পারছে না। বর্তমান সরকার রাজনৈতিক সরকার নয় বলে আমরা বেশি আশাবাদী ছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রতিশ্রুতি ছাড়া কিছুই পেলাম না।”
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার মধুপুর চরের কৃষক আশুতোষ সেন (৭০) জানান, তিস্তা নদীর ভাঙনে তার ৩০ বিঘা জমি বিলীন হয়ে গেছে। এখন তার নিজস্ব কোনো জমিই নেই। অন্যের জমিতে ঘর তুলে বসবাস করছেন তিনি।
“যখন শুনেছিলাম তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে, তখন মনে হয়েছিল জীবনের শেষ দিনগুলো অন্তত শান্তিতে কাটবে। তিস্তার বুক থেকে জমি ফিরে পেলে আবার চাষ করতাম। কিন্তু সেই স্বপ্নও ভেঙে গেছে,” বলেন তিনি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় এক কিলোমিটার প্রশস্ত তিস্তা নদী এখন কোথাও ৬ কিলোমিটার, কোথাও ৮–১০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে গেছে। “নদী খনন করে নির্দিষ্ট চ্যানেলে আনা গেলে বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি উদ্ধার সম্ভব। তিস্তা বাঁচলে আমরা বাঁচবো, বাঁচবে কৃষি অর্থনীতি ও জীববৈচিত্র্য। কিন্তু এখন সেই স্বপ্ন বিষাদে পরিণত হয়েছে,” বলেন আশুতোষ সেন।
কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার পশ্চিম বজরা গ্রামের কৃষক দবিরুল ইসলাম (৬০) বলেন, “বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার যেভাবে ঢাকঢোল পিটিয়েছিল, তাতে মনে হয়েছিল এবার সত্যিই তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু হবে। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই কাজ শুরুর জোরালো আশ্বাস ছিল। কিন্তু সেটাও আর হলো না।”
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সরকারের যদি সদিচ্ছা থাকতো, তাহলে বিদেশি ঋণের অপেক্ষা না করে নিজস্ব অর্থায়নেই কাজ শুরু করা যেত। তাহলে অন্তত আমরা মানসিক স্বস্তি পেতাম। এখন আমরা চরম হতাশ।”
তিস্তার ভাঙনে ১৫ বিঘা জমি ও বসতভিটা হারিয়ে দবিরুল ইসলাম বর্তমানে অন্যের জমিতে বসবাস করছেন এবং দিনমজুরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার চর গোবর্ধান এলাকার কৃষক সোলেমান মুন্সি (৭০) বলেন, “আবারও নির্বাচনের মৌসুমে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা এসে তিস্তা মহাপরিকল্পনার কথা বলছেন। কিন্তু তিস্তাপাড়ের মানুষ আর এসব কথায় বিশ্বাস করে না।”
তিনি বলেন, “শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় পানি নেই। নৌকা চলে না। চারদিকে শুধু ধুধু বালুচর। বালুচরে ভালো ফসলও হয় না। তিস্তা শুধু রাজনীতির হাতিয়ার হয়ে আছে। আমরা আর প্রতিশ্রুতি চাই না—বাস্তবায়ন চাই।”
লালমনিরহাট-২ (আদিতমারী-কালীগঞ্জ) আসন থেকে জামায়াতের প্রার্থী অ্যাডভোকেট ফিরোজ হায়দার লাভলু বলেন, “আমি নিজেও তিস্তাপাড়ের মানুষ। এখানকার মানুষের দুঃখ-কষ্ট আমি জানি। জনগণের রায়ে আমাদের দল ক্ষমতায় গেলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করা হবে।”
তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু—যিনি লালমনিরহাট-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী—চলতি জানুয়ারিতে কাজ শুরু না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, “২০২৫ সালজুড়ে আমাদের নেতৃত্বে তিস্তাপাড়ে লাখো মানুষ মানববন্ধন, সমাবেশ ও র্যা লিতে অংশ নেন। তিস্তাপাড়ের আন্দোলন দেশ ও বিদেশে আলোড়ন তুলেছিল।”
তিনি আরও বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুবর্ণ সুযোগ ছিল। তারা সেটা কাজে লাগাতে পারেনি। বিএনপি সরকার গঠন করলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এটা প্রতিশ্রুতি নয়—আমার অঙ্গীকার।”
উল্লেখ্য, গত বছর ১৭ ও ১৮ ফেব্রুয়ারি রংপুর বিভাগের পাঁচ জেলা—লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর, নীলফামারী ও গাইবান্ধার ১১টি পয়েন্টে একযোগে তিস্তাপাড়ে অবস্থান কর্মসূচি পালিত হয়।
৫ অক্টোবর জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টার কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। ৯ অক্টোবর তিস্তাপাড়ের উপজেলা শহরগুলোতে গণমিছিল এবং ১৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় তিস্তা নদীর দুই তীরে ১০৫ কিলোমিটারজুড়ে একযোগে মশাল প্রজ্জ্বলন কর্মসূচি পালন করা হয়।
গত বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান রংপুরের কাউনিয়ায় তিস্তাপাড়ে গণশুনানিতে অংশ নিয়ে দ্রুত প্রকল্পের কাজ শুরুর প্রতিশ্রুতি দেন। পরে তিনি জানান, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু হবে।
দুই ধাপে ১০ বছর মেয়াদি এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। প্রথম ধাপে পাঁচ বছরে ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ হাজার ১৫০ কোটি টাকা—এর মধ্যে ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা চীন থেকে ঋণ এবং ২ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল।
তবে চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনকে সঙ্গে নিয়ে রংপুরের কাউনিয়ায় তিস্তাপাড় পরিদর্শন শেষে উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জানান, আপাতত তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু হচ্ছে না। তবে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে দ্রুতই কাজ শুরু করা হবে।
কিন্তু তিস্তাপাড়ের মানুষের প্রশ্ন একটাই—এই ‘দ্রুত’ বলতে আর কত বছর অপেক্ষা করতে হবে?সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সহিদুল ইসলাম বিভাগীয় প্রতিনিধি রংপুরঃ 














